মো. গোলামুর রহমান, (লংগদু)
পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রেখে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী লংগদু জোন। নিরাপত্তার পাশাপাশি তারা দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
এই ধারাবাহিকতায় সেনাবাহিনী সহায়তার হাত বাড়িয়েছে স্বজনহারা, প্রতিবন্ধী ও আশ্রয়হীন রাকিবের দিকে। রাকিবের জন্ম রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার গাঁথাছড়া মিস্ত্রি টিলায়। তার জীবনের গল্প এক গভীর বেদনাময় অধ্যায়। ছোটবেলাতেই বাবা তাকে ও তার মাকে ছেড়ে চলে যান। মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে তাকে বড় করেন।
সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কঠিন জীবন সংগ্রাম
মাত্র দশ বছর বয়সেই কাজ শুরু করেন রাকিব। একসময় মা তাকে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। সেখানে বাসের হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে দক্ষতা অর্জন করে নিজেই হয়ে ওঠেন বাসচালক।
পরিশ্রম করে তিনি নিজের একটি ছোট সংসার গড়ে তোলেন। বিয়ে করেন একজন গার্মেন্টসকর্মীকে এবং তাদের ঘরে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। কিন্তু এই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ও জীবনের মোড় পরিবর্তন
একদিন দ্রুতগতির একটি বাসের আঘাতে রাকিবের চালানো বাস দুমড়ে-মুচড়ে যায়। সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তিনি এক পা পুরোপুরি হারান, অন্য পায়েও মারাত্মক আঘাত পান। তার জীবন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।
চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তার মা মানুষের কাছে হাত পাততে বাধ্য হন। শারীরিক অক্ষমতার কারণে রাকিব কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, আর এই সুযোগে স্ত্রীও সন্তানকে নিয়ে তাকে ছেড়ে চলে যান। সর্বহারা রাকিব শেষমেশ আশ্রয় নেন দূর সম্পর্কের নানার বাড়িতে।
রাকিবের প্রতি সেনাবাহিনীর মানবিক উদ্যোগ
রাকিবের দুর্দশার কথা শুনে সহায়তার হাত বাড়ান লংগদু জোনের জোন অধিনায়ক লে. কর্নেল হিমেল মিয়া, পিএসসি। রাকিব যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন, তাই সেনাবাহিনী তাকে একটি অটোরিকশা উপহার দেয়।
সাহায্য পেয়ে আবেগাপ্লুত রাকিব বলেন, “আমার আর যাওয়ার জায়গা ছিল না, সেনাবাহিনী আমাকে বাঁচার পথ করে দিয়েছে। না হলে আমাকে মানুষের কাছে হাত পেতে চলতে হতো। আমি সেনাবাহিনীর প্রতি চিরঋণী।”
রাকিবের মা রাহিমা বেগমও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “আমার ছেলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার ছিল। সেনাবাহিনী আমাদের জীবনে আলো এনে দিয়েছে। আমরা এই ঋণ কখনো শোধ করতে পারব না।”
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ও ভবিষ্যতে পাশে থাকার আশ্বাস
এ বিষয়ে লংগদু জোনের জোন অধিনায়ক লে. কর্নেল হিমেল মিয়া, পিএসসি বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় পাহাড়ি-বাঙালি সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। রাকিবের মতো অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্বের অংশ। ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ শুধু রাকিবের জীবনে পরিবর্তন আনেনি, বরং মানবিকতা ও সহমর্মিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
Leave a Reply