মো, সোহরাওয়ার্দী সাব্বির
একটা সময় ছিল, যখন পাহাড় নিঃশব্দে নিঃশ্বাস নিত। বাতাসে ভেসে আসত বুনো ফুলের গন্ধ, দূরে কোথাও ডাক দিত পাহাড়ি ময়না, আর পাতার নিচে লুকিয়ে থাকত বিরল প্রজাতির লজ্জাবতী কাঠবিড়ালি। আজ, সেই নিঃশ্বাস দগ্ধ হচ্ছে জুমের আগুনে।
এ যেন ধীরে ধীরে আত্মহত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছে পুরো এক ভূখণ্ড। শুকনো পাতার ওপর ছড়িয়ে পড়া আগুন শুধু জমিকে প্রস্তুত করছে চাষের জন্য নয়, পুড়িয়ে দিচ্ছে শতাব্দীর জীববৈচিত্র্যের সব স্মৃতি।
জুম চাষ—যা একসময় পাহাড়ি জনজাতির জীবিকা ও সংস্কৃতির প্রতীক ছিল, এখন পরিণত হয়েছে দাউদাউ আগুনের উৎসে। অরণ্যের গভীরে একের পর এক আগুন লাগানো হচ্ছে জমি পরিষ্কারের নামে। কিন্তু সেই আগুনের শিখা থেমে থাকছে না নির্ধারিত সীমানায়—তার গন্তব্য অনিশ্চিত, এবং পরিণতি ভয়াবহ।
পাহাড়ের বুকজুড়ে এখন জ্বলন্ত ছাইয়ের গন্ধ। ধোঁয়ার আস্তরণে ঢেকে যাচ্ছে নীলাকাশ। পাখির ডানার ছায়া আর দেখা যায় না আগের মতো, আর হরিণ কিংবা বুনো মোরগেরা যেন হারিয়ে গেছে শব্দহীন কোনো ঘোরের মধ্যে। আগুনের আগ্রাসনে তারা হয়তো নিজ বাসস্থান ছেড়ে চিরতরে চলে গেছে—বা নিঃশ্বাস নিতে না পেরে থেমে গেছে গভীর বনে।
এই আগুন নিছক আগুন নয়—এ যেন একটি নির্জন গুমোট শোক। পুড়ে যাওয়া গাছের গায়ে ভেসে ওঠে বাঁচার আকুতি, আর নিঃশেষ হওয়া জীবপ্রজাতির হাহাকারে স্পষ্ট হয় আমাদের অবহেলার ইতিহাস।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই আগুন কি শুধুই জমি পরিষ্কারের প্রয়োজন? নাকি এটি হয়ে উঠছে আমাদের অন্ধ লোভের প্রতিচ্ছবি?
জুম চাষের আগুনে পাহাড় হারাচ্ছে তার ছায়া, প্রাণ, আর শিকড়। এখনই যদি থামানো না যায়, পাহাড় একদিন শুধুই এক মৃতভূমি হয়ে উঠবে—যেখানে আগুনের ছাই ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।
Leave a Reply