খাগড়াছড়িতে ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে অপপ্রচার: পাহাড়ে অপ্রীতিকর ঘটনা রুখতে প্রকৃত সত্য জানা জরুরি-

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:৩৬ অপরাহ্ন, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১:০০ পূর্বাহ্ন, ০৮ জুলাই ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি সদরের কমলছড়ি ইউনিয়নের খালপাড় এলাকায় একটি বিরোধপূর্ণ জমির মালিকানাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত মারামারির ঘটনায় চিকিৎসাধীন এক ব্যক্তির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। 

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির লক্ষ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চালানো এই অপপ্রচারের বিপরীতে ঘটনার প্রকৃত সত্য এবং আইনি নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এটি মূলত দীর্ঘদিনের একটি ভূমি মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায় খাগড়াছড়ি সদরের কমলছড়ি ইউনিয়নের খালপাড় এলাকার ২৬৪ নং ভূয়াছড়ি মৌজা, ১৫৯ নং হোল্ডিং-এর আওতাধীন ৩১১ ও ৪১১ নং দাগে মোট ৩.০০ একর ভূমি মোছাম্মৎ নুর বানু বেগমের নামে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে। ১৯৮২ সাল থেকে এই জমিটি নুর বানু বেগমের জামাতা আবুল বাশির ভোগদখল করে আসছেন এবং সেখানে আম বাগান ও সবজি চাষ করছেন। ২০২৪ সালে বাশির নতুন করে আম চারা লাগালে প্রতিপক্ষ থৈলাঅং চৌধুরী আদালতে মামলা করেন, যার বিপরীতে বাশিরও পাল্টা মামলা করেন।

অন্যদিকে, প্রতিপক্ষ মংশিতু মারমার নামে ৭৬০ নং খতিয়ানে ৪৪৬ নং দাগে ৫ একর ভূমি রেকর্ডভুক্ত থাকলেও দেখা গেছে, উভয় পক্ষের দাবীকৃত ভূমির দাগ ও চৌহদ্দির মধ্যে কোনো মিল নেই। অর্থাৎ, ভিন্ন দাগের জমি নিয়ে মালিকানা দাবির জেরে এই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

গত ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ থৈলাঅং চৌধুরী ওই বাগানের ময়লা পরিষ্কার করে আগুন দিলে আবুল বাশিরের সাথে তর্কাতর্কি ও মারামারি শুরু হয়। এতে ৩ জন উপজাতি ও ১ জন বাঙালি আহত হন। এর মধ্যে গুরুতর আহত বিমল ত্রিপুরাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করা হলে গত ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

ঘটনার পর গত ১৫ জানুয়ারি মহালছড়ি জোনের (৬১ ইবি) ভূয়াছড়ি আর্মি ক্যাম্প, সদর থানা পুলিশ ও স্থানীয় চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে একটি মীমাংসা বৈঠক হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত ওই জমিতে কেউ চাষাবাদ করতে পারবে না।

জানা যায়,এই ঘটনায় উভয় পক্ষই খাগড়াছড়ি সদর থানায় মামলা দায়ের করেছে।বাঙালি পক্ষের মামলায়  ৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২০/২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। অভিযুক্তরা ইতিমধ্যে জামিন নিয়েছেন।

পাহাড়ি পক্ষের মামলায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৪/৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এই মামলায় পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে ইতিমধ্যে মোঃ আব্দুর রশিদ ও মোঃ আল আমিনকে (কুমিল্লা থেকে) গ্রেপ্তার করেছে। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছেন।

খাগড়াছড়ি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শাহাদাত হোসেন এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোঃ কামরুল ইসলাম এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, এটি সম্পূর্ণ একটি জায়গা-সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ। বিমল ত্রিপুরার মৃত্যু অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত, তবে এই ঘটনাকে পুঁজি করে ইউপিডিএফ (প্রসীত) বা অন্য কোনো কুচক্রী মহল যাতে 'পাহাড়ি-বাঙালি' ইস্যু তৈরি করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা অপপ্রচার চালাতে না পারে, সে জন্য গোয়েন্দা নজরদারি ও পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।

পাহাড়ের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি বজায় রাখতে ব্যক্তিগত বা আইনি বিরোধকে জাতিগত রূপ দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। কমলছড়ির এই ঘটনাটি সম্পূর্ণভাবে আইনের অধীন এবং প্রশাসন অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। সাধারণ মানুষকে কোনো ধরনের উসকানিমূলক অপপ্রচারে কান না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন স্থানীয়রা।