লেকের ধারে বেড়ে ওঠা মেধা, ল্যাবের তালায় আটকে যাওয়া সম্ভাবনা
পার্বত্য রাঙ্গামাটি মানেই শুধু পাহাড়, লেক আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য নয়। এই জনপদ মানে হাজারো সম্ভাবনা, হাজারো প্রতিভা আর অগণিত স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়ার যে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার—প্রযুক্তি—সেটিই আজ রাঙ্গামাটিতে সবচেয়ে অবহেলিত। বিশ্ব যখন প্রযুক্তির গতিতে দৌড়াচ্ছে, তখন পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা এখনো দ্বিধা, ভয় আর ভুল ধারণার বেড়াজালে আটকে আছি।
জাপানের মতো দেশগুলো তাদের শিশুদের খুব ছোট বয়স থেকেই প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করছে। খেলতে খেলতেই তারা শিখছে কোডিং, রোবটিক্স, সমস্যা সমাধান আর সৃজনশীল চিন্তা। সেখানে প্রযুক্তি মানে কেবল স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা নয়, বরং বাস্তব জীবনকে সহজ ও কার্যকর করার দক্ষতা অর্জন। অথচ রাঙ্গামাটির বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে অনেক স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব আছে কাগজে-কলমে, কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর দরজায় তালা ঝুলছে। যন্ত্রপাতি আছে, বিদ্যুৎ সংযোগ আছে—কিন্তু ব্যবহার নেই, প্রশিক্ষণ নেই, উদ্যোগ নেই।
এই তালা শুধু ল্যাবের দরজায় নয়, অদৃশ্যভাবে ঝুলে আছে পাহাড়ি শিশুদের ভবিষ্যতের ওপরও। কারণ প্রযুক্তি শেখার সুযোগ না পেলে তারা শুরু থেকেই পিছিয়ে পড়ে। শহরের শিক্ষার্থীরা যেখানে অনলাইনে কোর্স করে, নতুন নতুন স্কিল শিখে নিজেকে প্রস্তুত করছে, সেখানে রাঙ্গামাটির শিক্ষার্থীরা এখনো বইয়ের পাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
পার্বত্য অঞ্চলের সমাজ কাঠামোতে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার অনেক বাবা-মা সরল, পরিশ্রমী এবং সন্তানের ভালো ভবিষ্যৎ চান মনেপ্রাণে। কিন্তু প্রযুক্তি সম্পর্কে তাদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। তারা মনে করেন, মোবাইল বা কম্পিউটার মানেই সন্তান নষ্ট হয়ে যাবে, পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত হবে, নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হবে। এই ভয় আংশিক সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও এর সমাধান প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখা নয়, বরং সঠিক ব্যবহার শেখানো।
প্রযুক্তি আজ আর বিলাসিতা নয়; এটি জীবনের মৌলিক প্রয়োজনের অংশ। ব্যাংকিং থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি থেকে পর্যটন—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। রাঙ্গামাটির মতো পর্যটননির্ভর অঞ্চলে প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরি হলে স্থানীয় তরুণরা নিজের এলাকাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারত। অনলাইন মার্কেটিং, ডিজিটাল কনটেন্ট, পর্যটনভিত্তিক স্টার্টআপ—সবই সম্ভব। কিন্তু প্রয়োজন সেই দক্ষতা অর্জনের সুযোগ।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো মুখস্থনির্ভরতা। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার জন্য পড়ে, নম্বরের জন্য পড়ে। তারা শেখে কী লিখলে পাশ করা যাবে, কিন্তু শেখে না কীভাবে শেখা জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করা যায়। রাঙ্গামাটির পাহাড়ি শিশুদের মধ্যে রয়েছে প্রকৃতিগতভাবেই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, বাস্তববোধ আর সৃজনশীলতা। তারা প্রকৃতির সঙ্গে বড় হয়, বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হয়। যদি এই শক্তিকে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা যেত, তাহলে তারা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, সমস্যা সমাধানকারী ও উদ্ভাবক হিসেবেও গড়ে উঠতে পারত।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিক্ষক নিজেরাও প্রযুক্তিতে দক্ষ নন। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে তারা ল্যাব ব্যবহারে আগ্রহী হন না, কিংবা ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে ল্যাব চালু থাকলেও কার্যকর শিক্ষা হয় না। নীতিনির্ধারকেরা প্রকল্প নেন, যন্ত্রপাতি পাঠান, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তদারকি ও প্রশিক্ষণের অভাবে সেই প্রকল্পগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এই অবহেলার ফল ভোগ করছে রাঙ্গামাটির শিক্ষার্থীরা। তারা ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে, বড় স্বপ্ন দেখতে ভয় পাচ্ছে। অনেকেই মনে করে, “আমরা পাহাড়ে থাকি, আমাদের দিয়ে এসব হবে না।” এই মানসিকতা সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ কোনো অঞ্চল পিছিয়ে পড়ে শুধু অবকাঠামোর অভাবে নয়, পিছিয়ে পড়ে আত্মবিশ্বাসের অভাবে।
দিন শেষে পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা বইয়ের গোলকধাঁধার মধ্যেই ঘুরপাক খায়। তারা পরীক্ষায় পাশ করে, সনদ পায়, কিন্তু বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে না। কর্মসংস্থানের বাজারে গিয়ে তারা দেখে—শহরের শিক্ষার্থীরা অনেক এগিয়ে। এই ব্যবধান শুধু শিক্ষার নয়, এটি সুযোগের ব্যবধান, নীতির ব্যবধান এবং দৃষ্টিভঙ্গির ব্যবধান।
তাই আজ প্রশ্ন তোলা জরুরি—আমরা কি রাঙ্গামাটির সন্তানদের জন্য সত্যিই ন্যায্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করছি? প্রযুক্তির দরজায় তালা দিয়ে কি আমরা তাদের নিরাপদ রাখছি, নাকি অজান্তেই তাদের স্বপ্নের পথ রুদ্ধ করছি?
পরিবর্তন রাঙ্গামাটির জন্য কোনো বিলাসী চিন্তা নয়, এটি সময়ের দাবি।
পরিবর্তন আনা প্রয়োজন—পার্বত্য শিক্ষানীতিতে।
পরিবর্তন করা প্রয়োজন—স্কুলের ল্যাব সংস্কৃতিতে।
পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন—অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের মানসিকতায়।
প্রযুক্তিকে ভয় নয়, বরং পাহাড়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে সম্মান রেখে প্রযুক্তি শিক্ষা চালু করা যায়। হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, ছোট ছোট প্রকল্প, বাস্তব সমস্যাভিত্তিক শেখা—এই পদ্ধতিগুলো পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
কারণ পাহাড় যতই দুর্গম হোক, সঠিক সুযোগ পেলে রাঙ্গামাটির শিশুরা সেই পাহাড় ডিঙিয়ে অনেক দূর যেতে পারে। প্রযুক্তির দরজা খুলে দিলে শুধু ল্যাব নয়, খুলে যাবে হাজারো স্বপ্নের জানালা। আর সেই সিদ্ধান্ত আমাদের আজই নিতে হবে—না হলে ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে না।