আগামীকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

ঢাকা
ঢাকা ঢাকা
প্রকাশিত: ১:৪১ অপরাহ্ন, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১:০৯ পূর্বাহ্ন, ০৮ জুলাই ২০২৬

বাসস

আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ অনুষ্ঠিত হবে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে সারা দেশে ২৯৯ সংসদীয় আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন বাতিল করেছে ইসি। এ কারণে এই আসনটি বাদে ২৯৯ সংসদীয় আসনে একযোগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে বাসসকে বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন। এর পাশাপাশি ১ লাখেরও বেশি সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। নির্বাচন উপলক্ষে পুরো দেশকে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

নির্বাচন কমিশনার বলেন, এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং ভোটের দিনও পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে বলে তিনি আশাবাদী।

ভোটারদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, তারা যেন দল বেঁধে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে এসে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, এই নির্বাচন নিয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। কারণ দীর্ঘদিন ধরে অনেক মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান, তারা যেন সক্রিয়ভাবে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেন।

আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, একটি উৎসবমুখর ও নির্বাচন-বান্ধব পরিবেশে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। মানুষ ভয়-ভীতি ও শঙ্কাহীনভাবে ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট প্রদান করতে পারবেন এবং ভোট শেষে নিরাপদে নিজ নিজ বাসায় ফিরে যেতে পারবেন। এমন পরিবেশ বজায় থাকবে বলেই তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বাসসকে বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সব ধরনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভোট গ্রহণ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক, কারিগরি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করাই মূল বিষয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আরও বলেন, নির্বাচনে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এত বড় পরিসরে নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন এর আগে কখনও দেখা যায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এখন পর্যন্ত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা সমস্যা পরিলক্ষিত হয়নি বলেও জানান তিনি।

নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি প্রসঙ্গে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার আনুমানিক ৫৫ শতাংশের কম বা বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছি।’

দেশের মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এসব কেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ থাকবে বলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। এই নির্বাচনে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন।

নারী প্রার্থী ৮৩ জন (দলীয় ৬৩ জন এবং স্বতন্ত্র ২০ জন)। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। তাদের প্রার্থী সংখ্যা ২৯১ জন।

এই নির্বাচনে নিবন্ধিত ১০টি রাজনৈতিক দল কোনো প্রার্থী দেয়নি।

ইসি সচিবালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) মো. রুহুল আমিন মল্লিক বাসসকে জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে দেশের ২৯৯টি আসনের ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন বলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্র জানায়। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন।

৩০০ আসনের মধ্যে সর্বনিম্ন ভোটার ঝালকাঠি-১ আসনে ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন এবং সর্বোচ্চ ভোটার গাজীপুর-২ আসনে ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে ১৫ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। আর সবচেয়ে কম প্রার্থী রয়েছেন পিরোজপুর-১ আসনে, মাত্র ২ জন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা ৬৯ জন, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ৫৯৮ জন, প্রিজাইডিং অফিসার ৪২ হাজার ৭৭৯ জন, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন এবং পোলিং অফিসার ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৯৬৪ জন। এর পাশাপাশি পোস্টাল ভোটের দায়িত্বে থাকবেন প্রায় ১৫ হাজার কর্মকর্তা।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন রয়েছে।

এ ছাড়া নির্বাচনের নিরাপত্তায় প্রথমবারের মতো ইউএভি (আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল), ড্রোন ও বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে।

ইসি সূত্র জানায়, মোতায়েনকৃত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন— ১ লাখ ৩ হাজার সেনাসদস্য, ৫টি জেলার ১৭টি আসনে ৫ হাজার নৌসদস্য, ৩ হাজার ৫০০ জন বিমানবাহিনীর সদস্য, ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য, ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন বিজিবি সদস্য, ৩ হাজার ৫৮৫ জন কোস্টগার্ড সদস্য, ৯ হাজার ৩৪৯ জন র‍্যাব সদস্য, বিএনসিসির ১২৮টি সেকশনের ১ হাজার ৯২২ সদস্য এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ১৩ হাজার ৩৯০ জন ফায়ার সার্ভিস সদস্য।

নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচন-সংক্রান্ত অপরাধ আমলে নেওয়া এবং সংক্ষিপ্ত বিচার সম্পন্নের লক্ষ্যে ২৯৯টি আসনে মোট ৬৫৭ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। তারা ভোট গ্রহণের আগে দুই দিন, ভোটের দিন এবং ভোটের পরের দুই দিন—মোট পাঁচ দিন দায়িত্বে থাকবেন। এ সময়সীমা ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

এদিকে তফসিল ঘোষণার পর থেকে আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করতে প্রতি উপজেলা ও নির্বাচনী থানায় ন্যূনতম দুইজন করে মোট ১ হাজার ৪৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনে ৮১টি দেশি নিবন্ধিত সংস্থার মোট ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন। এদের মধ্যে ৭ হাজার ৯৯৭ জন কেন্দ্রীয়ভাবে এবং ৪৭ হাজার ৪৫৭ জন স্থানীয়ভাবে সংসদীয় আসনভিত্তিক পর্যবেক্ষণ করবেন।

নির্বাচন কমিশন জানায়, এই নির্বাচনে পর্যবেক্ষণ ও সংবাদ সংগ্রহের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক বাংলাদেশে এসেছেন।

আগতদের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৬০ জন প্রতিনিধি এসেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা থেকে প্রায় ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ৪৫টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১৫০ জন বিদেশি সাংবাদিক এসেছেন।

ইসির আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন ভুটান ও নাইজেরিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মালয়েশিয়ার নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিস (আইসিএপিপি)-এর স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ভোট বিডি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসী (ওসিভি) এবং দেশের অভ্যন্তরে (আইসিপিভি) মিলিয়ে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে প্রবাসী ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪৬ জন এবং দেশের অভ্যন্তরে ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৮ জন ভোটার।

ইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধনকারীদের মধ্যে আজ সকাল পর্যন্ত দেশে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৬৫ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। এ ছাড়া ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৮৫ জন প্রবাসী ভোটার ভোট দিয়েছেন।

ইসি সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনে ৩০০ আসনে ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল (রাজনৈতিক দলের ২ হাজার ৮৭টি এবং স্বতন্ত্র ৪৮১টি)। এর মধ্যে বাছাইয়ে ১ হাজার ৮৪২টি বৈধ এবং ৭২৬টি বাতিল হয়। পরবর্তীতে আপিল শুনানি শেষে ৪২৫ জন প্রার্থিতা ফিরে পান এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৩০৭ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন।

গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোট গ্রহণের দিন এবং তার আগে ও পরে কিছু যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

ইসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভোট গ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিবসের পূর্ববর্তী মধ্যরাত, অর্থাৎ ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।